বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ১২:০৯ পূর্বাহ্ন

মুজিব শতবর্ষে ‘বঙ্গবন্ধু ’ এক আলোকবর্তিকা

তনয় বিশ্বাস:
বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে যে মানুষটির আজীবন সংগ্রামে জেগে উঠেছিল সমগ্র জাতি, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যাঁর নেতৃত্ব পরিণত হয়েছিল স্বাধীনতা আন্দোলনে, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে যিনি ছিলেন একমাত্র প্রেরণার উৎস,  যিনি  হয়ে উঠেছিলেন দেশপ্রেমের প্রতীক, তিনি হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতি যখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নয়া উপনিবেশে পরিণত হল, ঠিক তখনই তিনি শোনালেন মুক্তির  অমর বাণী। যুক্তিনির্ভর ভাষণ আর আপোষহীন মনোভাবের কারণে তিনি পরিণত হলেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে। কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ের মনিকোঠায় স্থান করে নিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন বঙ্গবন্ধু।
ছাত্রজীবন থেকেই শেখ মুজিবের রাজনীতিতে হাতেখড়ি। ১৯৪৪ সালে তিনি ইসলামিয়া কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৪৭ সালে বিএ পাস করেন। যে বছর তিনি বিএ পাস করলেন, সে বছরই ভারত বর্ষ থেকে ইংরেজরা চলে গেল। ভারত বর্ষ বিভক্ত হলো দুটি রাষ্ট্রে। একটি হলো ভারত, অন্যটি পাকিস্তান। আমাদের আজকের বাংলাদেশ হয়ে গেল পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান। শেখ মুজিব চলে এলেন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকাতে।
১৯৪৯ সালে যখন আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তিনি জেলে। ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্নে যুক্ত থাকলেও তীব্র প্রতিবাদের সময়টি তাঁর কেটেছে কারাগারে। কারাগারে থাকা অবস্থাতেই তাঁকে আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে নির্বিচারে জনতার ওপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে তিনি কারাগারে অনশন শুরু করেন। ১৯৬৬  সালে তিনি পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙ্গে, বাঙালির সার্বিক মুক্তি অর্জনের  লক্ষ্যে ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ছয় দফাকে বলা হয় বাঙালির মুক্তির সনদ।
১৯৬৮ সালে তাঁর বিরুদ্ধে  উত্থাপন করা হলো কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। গ্রেফতার করা হলো শেখ মুজিবকে। কিন্তু ১৯৬৯ এর প্রবল গণআন্দোলনের কাছে ষড়যন্ত্রকারীরা নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়। বন্দীদশা থেকে মুক্তির পর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ছাত্র-জনতার বিশাল জনসভায় ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ কর্তৃক তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হলো।
আইয়ূব খান  ক্ষমতা হস্তান্তর করেন জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে। ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দিলেন নির্বাচনের তারিখ। ১৯৭০সালের ৭ ডিসেম্বর সর্বজনীন ভোটাধিকারের  ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হলো সাধারণ নির্বাচন। এই সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ এককভাবে বিজয় অর্জন করল। কিন্তু পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার চক্রান্তে মেতে ওঠে। এ চক্রান্তকারীদের কাছ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শোনান মুক্তির বাণী। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সমাবেশে তিনি বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করেন –
‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’’
এ ভাষণের মাধ্যমে বাঙালি জাতি পেয়ে যায় বাংলাদেশ স্বাধীন করার দিকনির্দেশনামূলক বার্তা।
২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। গ্রেফতার করা হয় বাঙালির প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। গ্রেফতারের আগে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল  তাঁর অবর্তমানে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হল। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের  বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হলে, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ফিরে এলেন। তাঁর আহবানে  মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে অস্ত্র জমা দেয় সরকারের কাছে। এ সময় ১০৪ টি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিল। তাঁর নেতৃত্বে জাতিসংঘের জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন ও ইসলামী সংস্থায় সদস্যপদ লাভ করে বাংলাদেশ।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গণপরিষদের সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘শাসনতন্ত্র প্রণয়ন কমিটি  ‘গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদকে’ মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচনা করেন। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর বলে প্রবর্তন করেন সংসদীয় সরকারের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার। ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বাকশালের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। তিনি শিল্প- কারখানা, ব্যাংক-বীমা ইত্যাদি জাতীয়করণ, রক্ষীবাহিনী গঠন এবং ২৫ বছর মেয়াদী ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি প্রভৃতি কাজ সম্পাদন করেন। ১৯৭৪ সালে গঙ্গার পানি বন্টন সংক্রান্ত ‘ফারাক্কা’ চুক্তি ও ভারত বাংলাদেশ ‘সীমান্ত’ চুক্তি সম্পাদন করেন তিনি।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত ও বিজ্ঞানভিত্তিক গণমুখী একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ে তোলা। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধী একদল উচ্ছৃংখল সামরিক অফিসারের হাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নির্মমভাবে সপরিবারে নিহত হওয়ার পর থেকে এদেশে শুরু হয় মানবিক বিপর্যয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শাসনের পালাবদলে বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। বাংলাদেশ সরকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী পালনের জন্য ২০২০-২০২১ সালকে ‘মুজিব বর্ষ’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত এই মুজিব বর্ষ উদযাপন করা হবে। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন, আবার ২০২১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ স্বাধীনতার অর্ধবার্ষিকীতে পদার্পণ করবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকায় ঘোষিত বর্ষের নামকরণ মুজিব বর্ষ করা হয়।
শুধু বাংলাদেশেই নয় ; জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক অঙ্গসংগঠন ইউনেস্কোর ৪০তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের সাথে যৌথভাবে ‘মুজিব বর্ষ’ পালনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ ক্ষেত্রে বলা যায় যে, বাংলাদেশের ঘোষিত ‘মুজিব বর্ষ’ আন্তর্জাতিকতা লাভ করেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের  প্রাদুর্ভাব এবং বাংলাদেশে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার এবং জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি জনস্বার্থে ও জনকল্যাণে ১৭ মার্চের পূর্বঘোষিত অনুষ্ঠান ছোট পরিসরে করার ঘোষণা দেয়। একই সাথে আমন্ত্রিত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সফরও বাতিল করা হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়।
সর্বোপরি বলা যায় যে, বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। আর মুজিব বর্ষ হচ্ছে বাঙালির উৎসব ও উৎকর্ষ সত্তা। দেশ ও জাতির উন্নয়ন,  বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে আজীবন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই দেশ ও জাতির উন্নয়ন,  বৈষম্যহীন সমাজ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার রঙে রাঙানো হোক আমাদের মুজিব বর্ষকে। মুজিব বর্ষের আলোকবর্তিকার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ুক সারা পৃথিবী জুড়ে। লেখক ও প্রাবন্ধিক: তনয় বিশ্বাস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *