শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২০, ০৬:৩৫ পূর্বাহ্ন

আল-মাহমুদের মহাকাব্যের অপ্রকাশিত অংশ

কেন আল মাহমুদ জীবনের শেষ ভাগে এসে মহাকাব্য রচনায় হাত দিয়েছিলেন। প্রায় দৃষ্টিহীন কবি বলতে গেলে মুখে মুখে রচনা শুরু করেন এই মহাকাব্য। কিন্তু শেষ করতে পারেননি। তার আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন (১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)। অসমাপ্ত এই মহাকাব্য পুস্তকারে প্রকাশিত হয়েছে এবারের একুশে বইমেলায়।

এখানে মহাকাব্য নিয়ে আল মাহমুদ তাঁর নিজের পরিকল্পনার কথা বলেছেন। সঙ্গে যুক্ত হলো মহাকাব্যের অপ্রকাশিত একটি অংশ

আমাদের ভাষায় মহাকাব্য লেখার প্রয়াস কেউ বহুকাল যাবৎ করেননি। বলা হয়ে থাকে, মহাকাব্য রচনার যুগ এখন আর নেই। কিন্তু এ কথাটি সমর্থনযোগ্য বলে আমার মনে হয়নি। কবিতার প্রকৃতপক্ষে কাল চিহ্নিত করে সীমারেখা টেনে দেওয়া সম্ভব নয় বলে আমার ধারণা। রবীন্দ্রনাথ মহাকাব্য রচনার চেষ্টা করেছিলেন কি না, সেটা আজকাল আর জানার উপায় নেই। তবে মহাকাব্য না লেখার একটি যুক্তি তিনি দিয়ে গেছেন।

আমি নাব্য মহাকাব্য সংরচনে ছিল মনে
হঠাৎ কখন তোমার কাঁকন কিংকনিতে
কল্পনাটি গেলো ফাটি হাজার গীতে
মহাকাব্য সেই অভাব দুর্ঘটনায়
পায়ের কাছে ছড়িয়ে আছে কণায় কণায়।

যদি মহাকবির এই কথাকে যুক্তি হিসেবে ধরা হয়, তাহলে সন্দেহ নেই এটা দুর্বল যুক্তি। এই যুক্তি মেনে নিতে মন চায় না। মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের একটা অক্ষমতাকে ঢাকতে অসংগত যুক্তি স্থাপনের চেষ্টা করে গেছেন। তাঁর এই চেষ্টা সফল হয়েছে—এ কথা বলা যাবে না। তবে রবীন্দ্রনাথের ওপর সাহস করে কথা বলার মানুষ আমরা কোথায় পাব? এ কারণেই সম্ভবত কেউ কোনো তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি না করে নিঃশব্দ থেকেছেন। কিন্তু এই নৈঃশব্দ্য আর কতকাল? কথা রবীন্দ্রনাথের হলেও মন এর বিপক্ষে যুক্তি খুঁজে বেড়ায়। এবং খুব বেশি হাতড়াতে হয় না। রবীন্দ্রনাথের সমস্ত বড়ত্ব, মহত্ত্ব ইত্যাদি মেনে নিয়েও বলতে ইচ্ছে করে, তিনি এ কথা না বললেও পারতেন।

আমাদের দেশে প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্ররচনার কোনো সমালোচনা হয়নি—এ কথা আমি বলব না। তবে সবাই তাঁর বড়ত্ব ও মহত্ত্বকে এতটাই মান্য করে নিচু স্বরে কথা বলেছেন, যা কেউ শুনেও না শোনার ভান করে চুপ করে ছিলেন। কিন্তু সাহিত্য সদাসর্বদা আলোচনা-সমালোচনা এবং সত্য উদ্‌ঘাটনে দুঃসাহসী হয়ে ওঠে।

একে দুঃসাহস না বলে শিল্প-সাহিত্যের অগ্রগতি বলাই যুক্তিসংগত। যখন প্রায় এক শত বছরের মধ্যেও এই কাজে কেউ মনোযোগ দেননি, তখন বুঝতে হবে যে কাজটি দুঃসাধ্য বলেই সবাই ভেবে নিয়ে সরে থেকেছেন। তবে কৌতূহলবশত কেউ যদি শেষ পর্যন্ত সাহস করে বিষয়টি নিয়ে একবার ভেবে দেখতে শুধু নয়, লিখতেও রাজি হয়ে যান, তাহলে কেমন হবে। আমার বিশ্বাস, এদিকে শুধু যে দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে তা-ই নয়, তাঁরা একটি কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনার সামনা-সামনি হবেন। ভালো হোক মন্দ হোক, কেউ একজন মহাকাব্য লেখার প্রয়াসী হয়েছেন, এটা শুধু কথার কথা নয়। এক অসাধারণ আয়োজন হিসেবে বিবেচনা পেতে পারে। সবাই বলবে, এই তো একজন মহাকাব্য লেখার প্রয়াসী হয়েছেন। এবং তাঁর কাব্যের কিছু অংশ প্রকাশ করেও এর সম্ভবপরতা সকলকে বিবেচনা করার সুযোগ দিয়েছেন। আসুন না, আমরা সকলে মিলে তাঁকে উৎসাহ জোগাই।

এখানে একটা কথা বলা উচিত, কবি ফররুখ আহমদ তাঁর ‘হাতেম তায়ী’ কাব্যগ্রন্থ রচনার সময় সম্ভবত এ বিষয়টি বিবেচনা করেছিলেন। ‘হাতেম তায়ী’ কাহিনিটি ফররুখ আহমদের রচিত নয়। তবে তাঁর হাতে আধুনিক বাংলা ভাষায় কাহিনিকাব্য হিসেবে ‘হাতেম তায়ী’ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ফররুখ আহমদের ছন্দ, উপমা, মিল—সবকিছু ‘হাতেম তায়ী’কে নানাভাবে সম্ভাবনাপূর্ণ এক দীর্ঘ কাব্য রচনায় মনোযোগী করে তুলেছিল। নানা পুথি এবং অতি প্রাচীন বিভিন্ন কাহিনি, যা পুথিতে পাওয়া যায়, তার ওপর নির্ভর করে তিনি ‘হাতেম তায়ী’ কাব্যটি রচনা করেছিলেন। সন্দেহ নেই, এটি তাঁর অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য এবং আধুনিক ভাষায় রচিত কাহিনিকাব্যের সূচনা করেছিল। তদুপরি বাংলা ভাষায় এ ধরনের প্রয়াস সম্ভবত কবি ফররুখ আহমদই করে দেখালেন। আমার বিশ্বাস, তিনি সফল হয়েছেন।

সমালোচনা তো হতেই পারে। তবু আমাদের চোখের সামনে কবি ফররুখ আহমদ ‘হাতেম তায়ী’ রচনা করে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তা অনায়াসে বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের অভিভূত করে রেখেছে। ফররুখ আহমদ কবি হিসেবে অত্যন্ত দৃঢ়চেতা এবং সচেতন কবিপ্রতিভা ছিলেন।

আল মাহমুদের অপ্রকাশিত মহাকাব্যের অংশ—

শেষ নাই এ খেলার মাঝে দেশ জাগে
কেশবতী নারী এক থাকে পুরোভাগে।
খোঁপায় সুগন্ধি ফুল গুঁজে হাত দিয়ে
এই সেই রমণী কি আজ যার বিয়ে।

জগতে বিবাহ হয় দুই মতামতে
প্রথমে কবুল বলে নারী বিধিমতে।
প্রস্তাব শুনিয়া কাঁপে তন্বীর গতর
যেন কাঁপে তনুদেহ কাঁপে থরথর।
এ কাঁপুনি ধরণিতে যদি শুরু হয়
প্রথম সে গেয়ে ওঠে নারীর বিজয়।
নারী ছাড়া স্পর্শের থাকে না তো কেউ
ইথারে বইতে থাকে বিদ্যুতের ঢেউ।
নিজের বসন ধরে বক্ষের ওপর
ওই তো রমণী রূপে সুন্দরের ঝড়
দাঁড়িয়েছে কোনোমতে তনুদেহ যার
চক্ষের পলকে হলো আকৃতি সোনার।
প্রকৃতি চারিদিকে স্তুতি করে গায়
আহা কী সুন্দর যেন স্বর্গের আভায়।

এ নারী ছড়ায় জ্যোতি অতি মনোরম
ভাষার সাধ্য নেই, সে তো নিরুপম।
কে দেবে উপমা তার কে দেবে তুলনা
সাবধান কেউ তার বসন খুলো না।
সৌন্দর্যের সব সংজ্ঞা লুটায় মাটিতে
মৃত্তিকার মহিমা যেন সোনার বাটিতে।
ধরেছে উচ্চে তুলে এর নাম মাটি
এতে গড়া হয় যত রূপ পরিপাটি।
যাদের গড়ন হলো মাটিতে অমর
তাদেরই বিজয় গায় মাটির অধর।

কেউ বলে কাদামাটি কেউ শুধু কাদা
কাদার ওপরে ধাঁধা ছড়ায় কে দাদা?
মাটি সেই উপাদান মাটি সেই খাঁটি
জগতের সব জ্বালা জুড়োয় এ মাটি।
মৃত্তিকার সোঁদা গন্ধে প্রাণের কাঁপন
শুরু হলে থরথর কাঁপে ত্রিভুবন।
এর মধ্যে ফুত্কারে প্রাণের সঞ্চার।
ধুকপুক করে যেন মাটির আধার।

মাটি নড়ে মাটি গড়ে মাটি উপাদান
মাটিকে দেখলে কাঁপে ভয়ে শয়তান।
লেলিহান শিখা তার ফুঁকারিয়া ওঠে
অগ্নির দহনক্রিয়া ওথলায় ছোটে।
বলে দাহ্য সবই দাহ্য আমি করি ছাই
আমার হাঁ মুখে আমি একাই দাঁড়াই।
আমার সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলে কারা
আমি চির অপরূপা সৌন্দর্যের ধারা।
শিখার বহ্নি জ্বালা অনলে অনিলে
কবিরা পঙ্‌ক্তি রচে যেন নভোনীলে।

মিল খুঁজে দিল খুঁজে খোলে বন্ধ খিল
হাট করে খুলে যায় সমস্ত নিখিল।
কবির কাব্য যার সমস্ত নিখিল।
কবির কাব্যকথা উচ্চকিত রসে
বুঝতে পারে না কেহ আছে কার বশে।

পলকে ছলকে যায় ভাষার বাঁধুনি
কান পেতে শোন ওই বিজয়ের ধ্বনি
ধ্বনির তরঙ্গে নাচে জগতের প্রাণ
কেউ গায় কাব্যকথা কেউ গায় গান।

আনন্দের লগ্নে যেন কার মুখ লাল
হাসিতে পড়েছে টোল ওই কার গাল।
নারীর রূপের সাথে তুল্য কিছু নেই
ঘুরে-ফিরে বলে সবে ওই তো সে, সে-ই।
কি মহিমা কি গরিমা অঙ্গের দেহলি
তরঙ্গে উপচে ওঠে শ্বেতপদ্মকলি।
নারী ছাড়া কিছু নেই জগতে সুন্দর
নারীর সম্মুখে গেলে, নারীই সুন্দর।
কখনো সে বধূ হয় কারও প্রিয়তমা
ওষ্ঠে লুকায় হাসি সেই তো প্রথমা।
কখনো ভগ্নির বেশ সেবিকার ছল
দুচোখে স্নেহের অশ্রু করে টলমল।
তবু সে তো মাতা ভগ্নি নহে প্রিয়তমা
ওষ্ঠের মাধুরী ঢেলে বলে আমি ক্ষমা।

জগৎ ঝরিয়া যায় এই পদতলে
কত অশ্রু কত রক্ত ভেসে যায় জলে।
আমি তো দাঁড়িয়ে আছি দশ হাত শাড়ি
আমাকে বেষ্টন করে বলে আমি নারী।
আমি তো নারীই বটে তুব কাড়াকাড়ি
আমার দখল নিতে করে বাড়াবাড়ি।
অস্ত্র নয় বস্ত্র নয় নহে অশ্রুজল
তার চে নরম হাত পরম কোমল
আছে যদি স্পর্শ করো অঙ্গের গরিমা
আমি মাতা আমি বধূ আমার কি সীমা
বেঁধে দিতে পারে কেউ নেই পরিসীমা।

আমি মেঘ আমি বেগ চঞ্চলা অধীরা
আমার কণ্ঠের মাঝে এক উষ্ণ হীরা
আমি একা পরে আছি এই জ্যোতি কণা
আমার প্রশংসা গায় জিব-কাটা খনা।
চারিদিকে কলরব উৎসবের ধ্বনি
আমি শুধু হাসি মুখ আমি মধ্যমণি।

নারীর গরিমা গেয়ে ছন্দে আনে মিল
জগতের সব কবি দেখে কালো তিল
নাসিকার বাম পাশে তিলকের শোভা
জগৎ সংসার কাঁপে একি মনোলোভা
চিহ্নের ফোঁটা এক ভিন্ন কালিতে
কে যেন দিয়েছে এঁকে সুবর্ণ বালুতে
এ তো শুধু বালু নয়, এরই নাম মাটি
মাটি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি তবু এ তো খাঁটি
হাত দিয়ে তুলে আনে যারা বালুকণা
তারা কি দেখতে পায় কাকে বলে সোনা?


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *