শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২০, ০৪:০৪ পূর্বাহ্ন

স্বাধীনতার প্রথম ইশ্তেহার পাঠের দিন ৩রা মার্চ

এম. কে. দোলন বিশ্বাস
আজ ৩রা মার্চ, স্বাধীনতর প্রথম ইশ্তেহার পাঠের দিন। ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ দিনটি ছিল বুধবার। একাত্তরের ওই দিনই স্বাধীনতার প্রথম ইশ্তেহার পাঠ করা হয়। ৩মার্চ দিনটি মুক্তিকামী বাঙালিদের স্বাধীকার আন্দোলনের উত্তালে পরিণত হয়। প্রতি বছর ঘুরে আমাদের দ্বারপ্রান্তে ফিরে আসে একাত্তরের ঐতিহাসিক ৩রা মার্চ। একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চ মাসের তৃতীয় দিন সারা বাংলাদেশে পূর্ণ দিবস হরতাল পালিত হয়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী স্বাধীকার আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে মুক্তিকামী জনগণ। চরম অসন্তোষ বিরাজ করতে দেখা গিয়েছিলো স্বাধীনমুখি গণমানুষের মধ্যে। পাকিস্তানিদের বাঙালিদের ওপর গণহত্যার প্রতিবাদে সেদিন বেলা এগারোটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় শিক্ষকদের এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ড. মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী। সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ণ আস্থা জানিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন-সংগ্রামে জনতার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করা হয়। গণ-আন্দোলেনের ভয়াবহতা দেখে জুলফিকার আলী ভুট্টো সদলবলে জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনা করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আলোচনার পর এক সংক্ষিপ্ত বেতার ভাষণে ১০ই মার্চ রাজনৈতিক নের্তৃবৃন্দের এক সম্মেলন আহ্বান করেন। ওদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্মেলনের প্রয়োজন নেই বলে তা সরাসরি প্রত্যাখান করেন। পূর্ব সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার কথাছিলো। ১লা মার্চ এক বেতার ভাষণে পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে। ওই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা পিপাসু পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের শিকার ক্ষুদ্ধ বাঙালিরা রাস্তায় নেমে পড়ে। বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ। অন্যদিকে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যুদ্ধে আহত মুমূর্ষূদের চিকিৎসার জন্য রক্তদানের আহ্বান জানানো হলে অসংখ্য মুক্তিকামী মানুষ রক্তদানের জন্য ভিড় করে মেডিক্যাল কলেজ মাঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় শিক্ষকদের প্রতিবাদ সভা থেকেই স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা আদায়ের লক্ষ্যে স্বৈরাচার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন ও লাগাতার হরতালের ডাক দেন। ফলে বাঙালি ও পাকিস্তানিদের মধ্যে দেখা দেয় চরম অসন্তোষ। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। বিক্ষোভে উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে এ দিন বিকেলে রাজধানী ঢাকার পল্টনে অনুষ্টিত হয় ছাত্র লীগের বিশাল জনসমাবেশ। লোকে লোকারন্য হয় পল্টন ময়দান। সংগ্রামী নেতাদের জ্বালাময়ী ভাষণে ধ্বনিত হয় স্বাধীনতার অক্তিম স্বপ্ন। বিশাল ওই সমাবেশ থেকেই বাঙালির জননন্দিত নেতা শেখ বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান জনতার মনের উত্তাপ প্রশমিত করে অহিংস আন্দোলনের ডাক দেন। এখান থেকেই স্বাধীনতার ইশ্তেহার পাঠ করেন তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ (বিএনপি’র শীর্ষ নেতা এবং সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী) ওই সময় পাকিস্তানি কর্তৃক দেশব্যাপী চলছিলো সামরিক আইন। পল্টনের জনসভা থেকে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেন, সামরিক আইন প্রত্যাহার করে আগের বছরের নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। স্বৈরাচার প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে উদ্দেশ্য করে বঙ্গবন্ধু আরো বলেন, ‘কালবিলম্ব না করে শীঘ্রই আমাদের দাবি মেনে নিন । তা হলে অন্যথায় বাঙালি জাতি এক পয়সাও ট্যাক্স খাজনা দেবে না।’ তিনি সব দাবি মেনে নিতে সামরিক জান্তাকে ৭ই মার্চ পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। একাত্তরের ৩ মার্চ বাঙালীর জীবন ও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। একাত্তরের ওই ঐতিহাসিক দিনেই ঘোষিত হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সব রাজনৈতিক ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ওই দিনটিতেই। পূর্ব সিদ্ধান্তের আলোকে ঘোষণা করা হয়, এ দেশের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’, পতাকা হবে সবুজ জমিনের মাঝে লাল সূর্য, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর রচনা ‘আমার সোনার বাংলা’ হবে জাতীয় সঙ্গীত, আর ‘জয় বাংলা’ হবে জাতীয় স্লোগান। বঙ্গবন্ধুকে বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক মনোনীত করে গেরিলা ও সম্মুখযুদ্ধের সব রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণও হয় ৩মার্চের দিনটিতেই। পাকিস্তানের স্বৈরসরকারের জেল-জুলুম-অত্যাচার, গুলি করে নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হত্যা ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার দাবিতে ৩মার্চ সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্ত সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়। বঙ্গবন্ধুর পূর্বঘোষিত ওই হরতাল সফল করার জন্য লাখ লাখ মুক্তিপাগল মানুষ ভোর থেকে বাঁশের লাঠি হাতে রাস্তায় নেমে আসে। বিকালে ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগ আয়োজিত পল্টনের বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, দু’দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বহু নিরপরাধ বাঙালিকে হত্যা করেছে। তিনি বলেন, এ দেশের মানুষের ট্যাক্সের পয়সায় কেনা অস্ত্র দিয়ে নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে স্বাধীকারের আন্দোলন-সংগ্রাম বন্ধ করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতায় দেশের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত খাজনা, ট্যাক্স প্রদান বন্ধ রাখার আহ্বান জানান। সেদিনের সভা মঞ্চে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা নুরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান, শ্রমিক নেতা আবদুল মান্নান প্রমুখ বক্তৃতা করেন। সভায় ঘোষণাপত্র ও প্রস্তাব পাঠ করেন ছাত্রলীগ নেতা এমএ রশীদ এবং ইশতেহার পাঠ করেন ছাত্রলীগ নেতা শাজাহান সিরাজ। ৫ দফা ঘোষণাপত্র ও ইশতেহারে স্বাধীন বাংলার জাতির পিতা ঘোষণা করা হয় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’কে। জাতীয় পতাকা হবে ‘সবুজের মধ্যে লাল সূর্য’ এবং জাতীয় সঙ্গীত হবে ‘আমার সোনার বাংলা’। তাছাড়া ৪ দফা ও ১৬ উপদফার স্বাধীনতার ইশতেহারে বলা হয়, আজ থেকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ঘোষণা করা হল। ৫৪ হাজার ৫০৬ বর্গমাইলের ভৌগোলিক এলাকায় ৭ কোটি মানুষের আবাস ভূমি স্বাধীন সার্বভৌম এ রাষ্ট্রের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হবেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক। মুক্তিবাহিনীর প্রধান হবেন ‘কর্নেল আতাউল গনি ওসমানী’। বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া ও সেনাবাহিনীর হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। ঘোষণাপত্রে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শোষণহীন সমাজব্যবস্থা কায়েম, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে স্বাধীনতা সংগ্রাম কমিটি ও মুক্তিবাহিনী গঠন করে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। বর্তমান সরকারের সব আইনকে বে-আইনি ঘোষণা করা হল। প্রতিটি অবাঙালিকে শত্রু বলে গণ্য করা হবে। খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দিতে হবে। পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করতে হবে।’ লাখো মানুষের এই সভায় ঘোষণাপত্র ও ইশ্তেহার পাঠের সঙ্গে সঙ্গেই জনসমুদ্র থেকে গগনবিদারী স্লোগান ওঠে বীর বাঙালি অস্ত্র ধর- বাংলাদেশ স্বাধীন কর, মুজিব তুমি এগিয়ে চল- আমরা আছি তোমার পিছে, জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। স্বাধিকার আন্দোলনের এ বজ নিনাদ ও যুদ্ধ ডাকের লেলিহান শিখা স্ফুলিঙ্গের মতো দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত প্রতিটি ঘরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি।] (তথ্য সূত্র : যুগান্তর-০৩.০৩.২০১৪) ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ও উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে পল্টনে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়। এদিনই বাংলার অদ্বিতীয় নেতা বঙ্গবন্ধু বাঙালিদের নেতা হিসেবে ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে প্রথম সতর্ক্যবাণী উচ্চারণ করে ঘোষণা দেন- ৪মার্চ থেকে ৬মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল পালন করা হবে। বঙ্গবন্ধু এসময় ঘরে ঘরে সংগ্রাম কমিটি ও মুক্তিবাহিনী গঠনেরও আহ্বান জানিয়ে আরো বলেন, ‘বাংলার গণ-প্রতিনিধিদের হাতে শাসনভার ছেড়ে দেওয়া এবং সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে না নিলে বাংলার মানুষ সরকারকে সহযোগিতা করবে না, কর-খাজনা দেবে না। পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত অফিস-আদালতে যাবে না।’ প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘যে মুহুর্তে বীর শহীদদের রক্তের দাগ রাজপথের বুক থেকে শুকিয়ে যায়নি, যখন বহু শহীদের নশ্বর দেহ দাফনের প্রতীক্ষায় পড়ে আছে, যখন শত শত বুলেটবিদ্ধ মানুষ হাসপালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে, সেই মুহুর্তে এ সম্মেলন বন্দুকের নলের মুখে নিষ্ঠুর তামাসা।’ ৩মার্চের সভা থেকেই বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান হোসেন সরওয়ারদ্দী উদ্যান) ৭মার্চের জনসভার ঘোষণা দেন। পঠিত ইশ্তেহারে বলা হয়, দেশের প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, থানা, মহকুমা, শহর ও জেলায় ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করতে হবে। গ্রামে গ্রামে, এলাকায় এলাকায় গঠন করতে হবে মুক্তিবাহিনী। ওই ইশ্তিহার পাঠের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতা ঘোষণা, সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধের আহ্বান, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতের অনুমোদনসহ স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় এবং সভায় উপস্থিতি লাখ লাখ মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে তা অনুমোদন করে। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রিয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা ছাত্রলীগ সভাপতি নুরে আলম সিদ্দিকী সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রিয় সংগ্রাম পরিষদের তৎকালীন অন্যতম নেতা ডাকসুর ভিপি আ.স.ম. আবদুর রব, স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রিয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক আব্দুস কদ্দুস মাখন সভায় স্বাধীনতা আদায়য়ের লক্ষ্যে বক্তব্য রাখেন। রক্তাক্ত একটি দিন একাত্তরের ৩ মার্চ। ওই দিন পাকিস্তানী আর্মিদের দ্বারা বাংলাদেশে প্রথম গণহত্যা করা হয়। সকাল ০৯ টার দিকে পাহাড়তলীর ওয়ারলেস কলোনীতে ইয়াহিয়া ও পাকিস্তান বিরোধী মিছিলকে কেন্দ্র করে বাঙালী-বিহারী সংঘর্ষ শুরু হয়। ওয়ারলেস কলোনীতে বিহারীরা সংখ্যায় বেশি ছিল। বিহারীরা কলোনীর বাঙালীদের ঘর-দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়। লুটপাট করা হয় বাঙালীদের ঘরবাড়ি-দোকাটপাট-স¤পত্তি। গরু জবাইয়ের মত জবাই করা হয় বাঙালীদের। মেয়েদের ধরে নিয়ে গ্যাং রেপ করে বিহারীরা। বাঙালীর রক্তে রঞ্জিত হয় পুরো ওয়ারলেস কলোনী। ওইদিন প্রায় ২৫০ জন বাঙালীকে হত্যা করা হয়। আহত হয় পাঁচ শতাধিক বাঙালী।পাহাড়তলীর ওয়ারলেস কলোনীর বাঙালী নিধনের খবর পুরো চট্টগ্রাম শহরে ছড়িয়ে পড়লে প্রতিশোধের নেশায় ফুঁসে উঠে বাঙালীরা। বাঙালীদের আয়োজনে দুপুরে লালদীঘিতে শোকসভা করা হয়। শোকসভায় আওয়ামীলীগ নেতা এম এ হান্নান, মৌলভী সৈয়দ আহমেদ, এম এ মান্নান, এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী সবাইকে ধৈর্য ধরার আহবান জানান। কিন্তু ইতোমধ্যে সংগ্রামের আগুন লেগে গেছে সারা শহরে। দেওয়ানহাট, ঈদগাঁ, হালিশহর ও পাহাড়তলীতে বাঙালী-বিহারী পৃথক পৃথক কয়েকটি সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। এসময় আরো একটি খবর সবাইকে বিচলিত করে দেয়, পাহাড়তলীর ওয়ারলেস কলোনীর সংঘর্ষের সময় পাকিস্তান আর্মির কিছু সৈন্য বেসামরিক পোশাকে বাঙালী হত্যায় অংশ নিয়েছিল। এদিকে বিক্ষুব্ধ মানুষের বিক্ষোভ আন্দোলনে ফেটে পড়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। প্রদেশব্যাপী হরতালের দিনে চট্টগ্রামেও এদিন পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। সন্ধ্যায় পশ্চিম পাকিস্তানের ইসলামাবাদ থেকে এক বেতার ঘোষণায় জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১০মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের পার্লামেন্টারি গ্রুপের ১২নেতার সঙ্গে বৈঠকে বসার প্রস্তাব দেন। বৈঠকে যোগদানের জন্য তিনি আমন্ত্রণ জানান, শেখ মুজিবুর রহমান, জুলফিকার আলী ভট্টো খান, আবদুল কাইয়ুম খান, মিয়া মমতাজ দৌলতানা, মাওলানা মুফতি মাহমুদ খান, আবদুল ওয়ালী খান, মাওলানা শাহ আহমদ নুরানী, আবদুল গফুর আহমদ, মোহাম্মদ জামাল কোরেফা, নরুল আমীন, মেজর জেনারেল জামালদার ও মালিক জাহাঙ্গীর খান প্রমূখ কে। অর্থাৎ ৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট লে. জেনারেল ইয়াহিয়া খান দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য প্রধান কয়েকটি রাজনৈতিক দলের (সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী) ১০ জন নেতাদের এক বৈঠক আহ্বান করেন। আওয়ামী লীগ, পিপলস পার্টি, মুসলিম লীগ, ন্যাপ, জামায়াতে ওলামায়ে পাকিস্তান, জামায়াতে ইসলামী ও পিডিপির নেতাদের বৈঠকে আহ্বান করা হলে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু ওই বৈঠককে ‘নিষ্ঠুর তামাশা’ বলে আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যান করেন।
অপরদিকে, বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতির মাধ্যমে ওই পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রদের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতিতে তিনি বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানে যখন নিরস্ত্র জনসাধারণকে ব্যাপকভাবে হত্যা করা হচ্ছে। শহীদের তাজা রক্ত যখন রাজপথে শুকিয়ে যয়িনি, অনেক নিহতের লাশ এখনো দাফন করা হয়নি, শতশত আহত ব্যক্তি যখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে সংগ্রাম করছে ঠিক সেই সময় বৈঠকে বসার জন্য বেতার ঘোষণা মারফতে আমন্ত্রণের প্রস্তাব নির্দয় তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ধরনের আমন্ত্রণ গ্রহণের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একাত্মা ঘোষণা করে বাংলার ছাত্র-জনতারাও ওই আহ্বান প্রত্যাখ্যান পূর্বক ঢাকার বিভিন্ন সড়কে মিছিল বের করে। মিছিলকারীরা আলোচনার ষড়যন্ত্রের চেয়ে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় থাকার জন্য বিভিন্ন সেøাগান দিয়ে মিছিল অব্যাহত রাখে। পাকিস্তানিদের ওই আমন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই মাওলানা ভাসানীর পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে নিন্দাসূচক টেলিফোনও পৌছে যায় ইয়াহিয়ার নিকট।
এদিন ঢাকার পল্টনে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত বিশাল জনসভায় অসহযোগের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতিষ্ঠার মাত্র ২৪বছরের মধ্যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখার জন্য তৎকালীন পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পুরো বিষয়টির ভেতর দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেলেও পুর্ব পাকিস্তান তথা বাংলার মানুষের কাছে স্বাধীকার আদায় ছিলো প্রাণের দাবি। একাত্তরের ৩ মার্চ দিনই প্রথম বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপরেখা ঘোষিত হয়। এদিন বঙ্গবন্ধু অন্য এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘এমন কতিপয় লোকের সঙ্গে আমাদের বৈঠকে বসার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাদের জঘন্য ও ঘৃণা চক্রান্তের কারণে নিরীহ, নিরস্ত্র, চাষী, শ্রমিক ও ছাত্রদেরকে প্রাণ দিতে হয়েছে।’ রাতে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে ১০ মার্চের গোলটেবিল আলোচনায় যোগ না দেয়ার ঘোষণা দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪৮ জন শিক্ষক এদিন যৌথ বিবৃতিতে দেশকে বিপর্যয় ও শোষণ শ্রেণীর হাত থেকে রক্ষার জন্য দেশ প্রেমিক জনগনের প্রতি আহ্বান জানান।
অপরদিকে, এদিন এক সরকারি ঘোষণায় ঢাকা পৌর এলাকায় রাত ১০টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত ‘সান্ধ্য’ আইন জারি করা হয়। রংপুর শহরে দুপুর আড়াইটা থেকে ২৪ঘন্টা এবং সিলেট শহরে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ‘সান্ধ্য’ আইন জারি করা হয়। বাঙালি জনতা ‘সাধ্য’ আইন ভেঙ্গে রাস্তায় রাস্তায় মিছিল বের করে।
পাকিস্তানি হায়েনাদার পুলিশ নির্বিচারে মুক্তিকামী মিছিলকারি জনতাদের ওপর গুলিবর্ষন করে। গভীর রাত পর্যন্ত ঢাকা নগরী এক বিস্ফোরিত নগরীতে পরিণত হয়। একাত্তরের সেদিন দেশের অন্যান্য স্থানের মতো পাকিস্তানি বাহিনীরা চালায় রংপুরে হত্যাকাণ্ড। শংকুর নামের একব্যক্তিকে হত্যা করার মধ্যে দিয়ে রংপুরে শুরু করে পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। পরদিন ৪ মার্চ সকালে ঢাকা নগরীর বিভিন্ন সড়ক থেকে বাঙালিদের কমপক্ষে ১৫টি লাশ উদ্ধার করা হয়। চট্টগ্রামে শহীদ হন নাম জানা অজানা আরো ৭১জন বাঙালি। এদিন হাসপাতাল গুলোতে ক্রমেই বাড়তে থাকে আহতদের সংখ্যা। রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অজর্নে শুরু হয় লড়াকু বাঙালির প্রস্তুতি।
দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত ৪ঠা মার্চের এক রিপোর্টে জানা যায়, ‘সেনাবাহিনীর গুলিতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৭৫জন নিহত হয়। ৩রা মার্চ চট্টগ্রামের পিরোজশাহ কলোনি, অয়্যারলেস কলোনি, আমবাগান, পাহাড়তলী, জুট ফ্যাক্ট্ররি এবং সন্নিহিত অন্যান্য এলাকায় সকাল হইতে অপরাহ্ন পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ড, হামলা, প্রতিহামলা, প্রাইভেট বন্দুকের গুলি-বর্ষণ, সংঘর্ষ এবং আইন শষৃঙ্খলার রক্ষা বাহিনীর গুলি বর্ষণ ইত্যাদি ঘটনার অন্যূণ অর্ধশতাধিক লোক প্রাণ হারাইয়াছে।’
চট্টগ্রামের উপরোক্ত অবাঙালি এলাকা থেকে সিভিল পোষাকে পরিহিত ২০তম বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যদের অবস্থান ও গুলি-বর্ষণের খবর শহরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং সমগ্র শহরে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করে। ওই খবরে স্থানীয় ই.পি.আর. সৈনিকদের উত্তেজিত হতে দেখ যায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *