বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০১:২৫ অপরাহ্ন

সিপিবির উগ্র ভূমিকায় ক্ষুব্ধ সকলে

বিশেষ প্রতিনিধিঃ
দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) রাজনীতিতে তার অতীতের ধারা থেকে অনেক দূর সরে গিয়েছে বলে অভিযোগ দলের শুভানুধ্যায়ীদের। সিপিবির এমন কক্ষচ্যুতি ও সাম্প্রতিক উগ্র হঠকারি ভূমিকায় দলের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে প্রকাশ্যেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপিকে অনুসরণ, বিভিন্ন ঘটনা ও ইস্যুতে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ-বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া বর্তমান সময়ে যথাযথ হচ্ছে না। এমন কি বিভিন্ন গণসংগঠনে পার্টি লাইন প্রতিষ্ঠার নামে ঐক্য বিনষ্ট করা হচ্ছে। শ্রমিক সংগঠন থেকে সরকার সমর্থকদের বের করে দেয়ার জন্য পার্টি থেকে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি-জামাতের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অভিযুক্ত কোটা বিরোধীদের সাথে ছাত্র ইউনিয়ন জোট বেধেছে। ফলে সিপিবির ভূমিকায় শুভানুধ্যায়ী ও পুরাতন মিত্রদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে।
গত ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯ সিপিবির বিক্ষুব্ধ শীর্ষ নেতৃবৃন্দের এক অনানুষ্ঠানিক সভায় দলের প্রাক্তন সভাপতি ও দেশের বয়জৈষ্ঠ শ্রমিকনেতা সহিদুল্লাহ চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন। তিনি এমনকি দল রক্ষার প্রয়োজনে সিপিবির বর্তমান সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কে সরিয়ে দেয়ার কথা বলেন। সহিদুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যদি পজিশন নেই তাহলে তিনি থাকবেই না পার্টিতে’। এসময় সিপিবির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম তার কথায় সায় দেন। তিনি কাউকে কাউকে পক্ষে টানার পরামর্শ দেন। উক্ত সভায় অংশ নেয়া জনৈক নেতা সহিদুল্লাহ চৌধুরীর বক্তব্যের অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করলে সিপিবির অভ্যন্তরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্রের বরাতে জানা যায়, গত ৬ ও ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ সিপিবি সমর্থিত শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রে (টিইউসি)র ১০ম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সিপিবির মধ্যে অঙ্গ সংগঠন চর্চা না থাকায় এর সংগঠন গুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতের লোকেরা মিলেমিশে কাজ করেন। তেমনি টিইউসির মূল নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়াও আওয়ামী লীগ ও এর শরীক দলের শীর্ষ নেতারা আছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সিপিবির অতি বিপ্লবী একটি অংশ টিইউসিকে দলের নিয়ন্ত্রনে নিতে নানান হঠকারী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। সহিদুল্লাহ চৌধুরীর অভিযোগ এ সকল কার্যক্রমে নিরব সমর্থন যোগাচ্ছেন দলের সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ বর্তমান নেতৃত্ব।
গত ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯ অনুষ্ঠিত সভার প্রকাশিত অডিওতে [https://soundcloud.com/user-557649484/mnjufzbcjt20] সহিদুল্লাহ চৌধুরী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সম্পর্কে বলেন,
সহিদুল্লাহ চৌধুরীঃ চরম দ্বিচারিতা করতেছে; মুখে একটা বলে কাজ করে একটা। দ্বিচারিতা! দ্বিচারিতা করতেছে না?
পার্টির প্রেসিডেন্ট, মূল লোক। হে যদি এইটা করে তো পার্টির দায়িত্ব নিছে কেন?
পার্টির …… (অস্পষ্ট) হয়ে গেছে অলরেডি।
আর আমরা যদি পজিশন নেই তাহলে তিনি থাকবেই না পার্টিতে।
সুতরাং, আমার তো …… (অস্পষ্ট)হারানোর আছে কিছু এখন, কন?
মো. শাহ আলমঃ পার্টিতে তো হারানোর কিছু নাই।
সহিদুল্লাহ চৌধুরীঃ ……(অস্পষ্ট)ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র বিশ বছর ভরা বাইর করে নিয়া আসলো না কেন?
মো. শাহ আলমঃ পার্টিটাকেই রক্ষা করতে হবে।
সহিদুল্লাহ চৌধুরীঃ পার্টি রক্ষার অবশ্যই চেস্টা করবো। কিন্তু আমি ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের ক্ষতি কইরা পার্টি রক্ষা করা, এইটা করবো না।
ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রও রক্ষা করবো, পার্টিও রক্ষা করবো।
আর হেরা যদি পারে করতে থাকুক, পার্টির একটা সংগঠন কইরা দেখাক, হ্যাডাম থাকলে।
ত্রিশ বৎসর একটা আনপ্রোডাক্টিভ ……বাচ্চাদের সমর্থনে, একটা বান্ধা ইয়া নিয়া গার্মেন্ট ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র সমস্ত সম্পদ পার্টির ব্যয় করছে, অফিস ব্যয় করছে, লাভটা কি হইছে?
মো. শাহ আলমঃ আপনি মৃনাল দাদের সাথে কথা বলেন। মৃনাল দা (সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের পুর্বাঞ্চলীয় কমিটির সভাপতি মৃনাল চৌধুরী) কে পক্ষে টানেন।

গত সম্মেলনে টিইউসির সভাপতি ও সিপিবির উপদেষ্টা সহিদুল্লাহ চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অন্যতম শীর্ষনেতা ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান সমঝোতার ভিত্তিতে নতুন কমিটি গঠন করেন। তারা উক্ত কমিটি কাউন্সিলে উপস্থাপন করলে অধিকাংশ কাউন্সিলর তা মেনে নেয়। কিন্তু সিপিবির কয়েকজন শ্রমিকনেতার নেতৃত্বে গঠনতন্ত্র রক্ষা ও নির্বাচনের দাবিতে কাউন্সিলে হট্টগোল হয়। এ ঘটনায় সহিদুল্লাহ চৌধুরী সিপিবিতে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে এক তরুণ শ্রমিকনেতার শাস্তি দাবি করেন। সূত্রের দাবি মোতাবেক, সিপিবির বর্তমান নেতৃত্ব তথা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও তার অনুসারী প্রেসিডিয়াম সদস্যদের আনুকুল্য পাওয়ায় ঐ শ্রমিকনেতার শাস্তি হচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিপিবির কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর এক নেতা বলেন, ‘দলের বর্তমান নেতৃত্ব যেভাবে দলকে ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত করেছে তাতে করে সিপিবিকে আর চেনা যায় না। সিপিবির সাম্প্রতিক অনেক পদক্ষেপ চরম প্রতিক্রিয়াশীল বিএনপি-জামাতের সাথে মিলে যাচ্ছে। ফলে দ্বি-দলীয় ধারার বাইরে বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তোলার কাজ মারাত্মক ভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।’

চলমান সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সিপিবি মূলগত ভাবে ডান প্রতিক্রিয়াশীলতা ও বাম হঠকারীতা বিরোধী একটি দল। ঢাকা উত্তরের গত উপনির্বাচনে প্রার্থী ঠিক থাকলেও জোট শরীকদের চাপে এবং দলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। ফলে সিপিবির বক্তব্য মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার বিরাট সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত হই।’ তিনি জানান, ‘এবার আর তেমনটি ঘটেনি। ফলে সিপিবির রাজনৈতিক বক্তব্য ও ঢাকাবাসীর প্রানের দাবি গুলো নিয়ে মানুষের মাঝে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।’ তিনি আরো জানান, এবছরই সিপিবির দ্বাদশ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবে। সিপিবিই দেশের একমাত্র দল, যার কংগ্রেসে সারা দেশ থেকে নির্বাচিত হয়ে আশা প্রতিনিধিরা গোপন ব্যালটে ভোট দিয়ে গোটা কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত করে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *