ব্ল ইকোনমি, সিলিন্ডার গ্যাস ও নিরাপত্তাহীনতা

বিশ্বের প্রায় সব শিল্পোন্নত দেশই জ্বালানী খাতে আমদানি নির্ভর। এশিয়ার শীর্ষ শিল্পোন্নত দেশ জাপান জ্বালানি সহ শিল্পের প্রায় সব কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করে পণ্য উৎপাদন ও রফতানির মাধ্যমে দেশকে সমৃদ্ধির শিখরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। আমদানিকৃত জ্বালানিকে জনগণের জীবনমান উন্নয়নে এবং উৎপাদনরশীল খাতে ব্যয়ে দূরদর্শি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হলে এ থেকে এক শ্রেণীর মধ্যস্বত্বভোগি লাভবান হলেও আখেরে দেশের কোনো লাভ হয় না। দেশের খনিজ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও প্রফিট শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানীর সাথে দর কষাকষি ও সমঝোতায় দেশের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে অনেক সম্ভাবনাময় দেশও অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। গত কয়েক দশকের ইতিহাসে এমন বেশ কিছু নজির খুঁেজ পাওয়া যায়। ইরাক, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, ভেনিজুয়েলা অতি সাম্প্রতিক উদাহরণ। জ্বালানি সম্পদের কারণে অনেক দেশ পশ্চিমাদের হেজিমনি এজেন্ডায় পরিনত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বাস্তবতা থেকে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় রয়েছে। পঞ্চাশের দশকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার হিসেবে ইরানের মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ইরানের তেল সম্পদের উপর বৃটিশ কোম্পানীর দখলদারিত্ব খর্ব করে তা রাষ্ট্রায়াত্ব কোম্পানীতে পরিনত করার খেসারত হিসেবে অ্যাংলো-আমেরিকার যৌধথ প্রযোজনায় সংঘটিত অভ্যুত্থানে মোসাদ্দেক সরকারের পতন ঘটিয়ে সেখানে শাহের ক্ষমতা পুন:প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ইমাম খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইরানের তেল সম্পদের উপর পশ্চিমাদের দখলদারিত্ব কায়েম ছিল। তবে ইরান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সব তেল সম্পদের উপর পশ্চিমাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এখনো অটুট রয়েছে। যে সব দেশে জ্বালানিসহ অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় খনিজ সম্পদের ভান্ডার রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, সে সব দেশকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণের পশ্চিমা নীলনকশা সদা সক্রিয় রয়েছে। শোনা যাচ্ছে, আমদানিকৃত এলএনজির মূল্য গ্যাসের চেয়ে কয়েকগুন বেশি পড়বে। টেক্সটাইল ওভেনসহ যে সব শিল্প কারখানায় প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ রয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে রফতানি বাণিজ্যে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রেখেছে তারা কি তিনচারগুন বেশি দামে এলএনজির মূল্য পরিশোধের পর বাণিজ্যিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে? এটা এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমাদের দেশে সরকারি অবকাঠামো, সড়ক-মহাসড়ক ও ফ্লাইওভার নির্মানব্যয়ে অস্বাভাবিক বেশি। প্রতিবেশি ভারত- চীন থেকে প্রায় ১০ গুন এমনকি জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ থেকেও কয়েকগুন বেশি মূল্য দিয়ে মহাসড়ক নির্মানের রেকর্ড আমাদের। এমন অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে অবকাঠামো নির্মান ব্যয়ের মোজেজা ক্যাসিনো বিরোধি অভিযানের পর জনগনের কাছে কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে রাখতে জিকে শামীম প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকা সরকারের মন্ত্রী-আমলাদের দিত বলে জানা গেছে। এভাবেই অবকাঠামো খাতের প্রাক্কলিত ব্যয় ইচ্ছামত বাড়িয়ে নিত সরকারের ছত্রছায়ায় থাকা এসব টেন্ডারবাজ জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনকারিরা। এভাবেই ৭০০ কোটি টাকার ফ্লাইওভার শেষ পর্যন্ত ৩০০ কোটিতে দাঁড়ায়। বালিশের কভারের দাম ২৮ হাজার টাকা, হাসপাতালের রোগির পর্দার দাম দাড়ায় ৩৭ লাখ টাকা। এলএনজি টার্মিনাল নির্মান করতে কত ব্যয় হয় তা আমাদের জানা নেই। মাতারবাড়ি অফশোর টার্মিনালের নির্মান ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। দেশের তেল-গ্যাস সম্পদের উন্নয়নে এ টাকা খরচ করলে জ্বালানী খাতে বিকল্পহীন আমদানি নির্ভর থাকতে হত কি না তা জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাই ভাল বলতে পারবেন।
প্রায় এক দশক ধরে সরকারের পক্ষ থেকে ব্ল ইকোনমির সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। বিশেষত মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমান বিরোধ আন্তর্জাতিক আদালতের আইনগত প্রক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিরসন হওয়ার পর এ নিয়ে বেশ শোরগোল হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অশ সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বলে গণ্য হলেও গত ৮ বছরেও বাংলাদেশ এ সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারেনি। তবে প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা নিয়ানমার ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি বল্ক থেকে গ্যাস উৎপাদন করে পাইপলাইনে সরবরাহ শুরু করেছে। বাংলাদেশের পানিসীমার কাছাকাছি এলাকায় ভারতও কূপ খনন করে গ্যাস উত্তোলন শুরু করেছে বলে জানা যায়। অথচ শিল্পায়ণ, গৃহায়ণ খাতের হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ গ্যাসের অভাবে মুখ থুবড়ে থাকা বাংলাদেশেরই এ ক্ষেত্রে ত্বরিৎ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও আমরা কেন পিছিয়ে থাকলাম, পিছিয়ে পড়লাম তা সত্যি বিষ্ময়কর। সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশ অংশের ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকায় মোট ২৬টি বøকের অনেকগুলোই তেল গ্যাসের বিশাল সম্ভাবনাময় মজুদ থাকার জল্পনা দীর্ঘদিনের। নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে বঙ্গোপসাগরের অগভীর অংশে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হলেও ১৫ বছরের মধ্যেই সেই গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে ২০১৩ সালে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। গত দুই দশকে বেশ কয়েকটি পুরনো গ্যাসক্ষেত্র বন্ধ হয়ে গেলেও সে অনুপাতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উন্নয়ন ঘটেনি। উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের মাত্র৭ বছরের মাথায় ১৯৫৫সালে সিলেটের হরিপুরে প্রথম গ্যাস ক্ষেত্র আবিস্কৃত হয় এবং ৫ বছরের মধ্যেই তা বাণিজ্যিক সঞ্চালন শুরু করে। সমুদ্রসীমা বিরোধ নিস্পত্তি না হওয়ায় বঙ্গোপসাগরে এতদিন সাগরে অনুসন্ধান ও ড্রিলিং শুরু করা যাচ্ছে না বলে অজুহাত দেখানো হলেও ২০১২ সালে মিয়ানমারের সাথে বিরোধ নিস্পত্তি হওয়ার সাথে সাথেই মিয়ানমার পুরোদমে গ্যাস অনুসন্ধ্যান কাজ শুরু করে ২০১৬ সাল থেকে থালিন-১ নামক ব্লক থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু করেছে। এ ব্লকে সাড়ে চার টিসিএফ(ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট) গ্যাস মজুদ রয়েছে বলে জানা যায়। এর দুই বছর আগেই বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে মার্কিন কোম্পানী কনোকো ফিলিপস্রে দ্বি মাত্রিক জরিপে সাড়ে ৭ টিসিএফ গ্যাসের মজুদের তথ্য প্রকাশ করা হয়। দুটি ব্লকে এ পরিমান মজুদের পরিমান দেশের স্থলভাগের ২৬টি গ্যাস ক্ষেত্রের সামগ্রিক মজুদের অর্ধেকের বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গোপসাগরের ১২ নম্বর ব্লকেও গ্যাসের বিশাল মজুদের কথা শোনা যাচ্ছে। কনোকো ফিলিপসের সাথে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের মূল্য ৪.২ ডলার যা পরবর্তিতে ৭ ডলারের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর মধ্যে সরকারের রাজস্ব বাদ দিলে গ্যাসের মূল্য দাড়ায় ৫ ডলারের কম। সেখানে বর্তমানে এলএনজি ক্রয় করা হচ্ছে কমপক্ষে ১৬ ডলারে। এর মানে হচ্ছে, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের সহজ রাস্তা উন্মুক্ত না করে তিনগুন বেশি দামে এলএনজি আমদানির মাধ্যমে চাহিদা পুরণের পথ বেছে নেয়া হচ্ছে। গত আগস্ট মাস থেকে বাংলাদেশ এলএনজি যুগে প্রবেশ করেছে। জরুরী প্রয়োজনে গ্যাস আমদানির যুক্তি হয়তো মেনে নেয়া যায়। তবে যারা এ ক্ষেত্রে জাপান,দক্ষিন কোরিয়া বা তাইওয়ানের উদাহরণ দেন তাদেন মনে রাখা উচিৎ প্রথমত: বাংলাদেশ সে সব দেশের মত শিল্পোন্নত নয়, দ্বিতীয়ত: সে সব দেশে বাংলাদেশের মত ১০-২০ টিসিএফ পরিমান গ্যাসের মজুদ নেই। বঙ্গোপসাগরের ২৬ ব্লকের বেশিরভাগে এখনো সার্ভেই করা হয়নি। আমাদের সরকার ২৪ হাজার কোটি টাকায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মানে সক্ষম হলেও সাড়ে নয়শ কোটি টাকায় সার্ভে জাহাজ কিনতে বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও তার কোনো সুরাহা হয়না। তবে ইতিমধ্যে খবর বেরিয়েছে, বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশে,র পানিসীমার নিকটবর্তি ব্লক থেকে গ্যাস উত্তোলনের গতি ৩ গুণ বাড়াচ্ছে ভারতের রাষ্ট্রায়াত্ব কোম্পানী ওএনজিসি। কৃষ্ণা গোদাবরি ব্লকে ৫০ টিসিএফ গ্যাসের মজুদের প্রত্যাশা করছেন ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের ব্ল ইকোনমির সম্ভাবনার বাস্তবতা এখনো যেন পলিটিক্যাল রেটরিক মাত্র। একদিকে ভারতীয় জেলে ও জলদস্যুদের কারণে বাংলাদেশের জেলেদের জন্য সমুদ্রে মাছ আহরণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জলদস্যুতা ও প্রাণ সংশয়ের ভয়ে কারণে তারা সমুদ্রের অর্থনৈতিক অঞ্চলে মাছ ধরতে যেতে ভয় পায়। এ সুযোগে ভারতীয় জেলেরা বড় ফিশিং ট্রলার ও উন্নত জাল ব্যবহার করে বাংলাদেশের পানি সীমার ৩০-৪০ কিলোমিটার ভিতরে প্রবেশ করে মাছ ধরে নিয়ে যায়।গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের পানিসীমা থেকে নৌকাসহ শত শত ভারতীয় জেলে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে ভারতীয় পানিসীমা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বড় হলেও তারা ইলিশ ধরতে বাংলাদেশের পানিসীমাকেই টার্গেট করছে। একইভাবে তারা গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সন্নিহিত অঞ্চল থেকে তিনগুন গতিতে গ্যাস উত্তোলনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গ্যাসের সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে আর কেনো নতুন গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে না। এখন থেকে নতুন আবাসিক ভবন ও শিল্প কারখানাকে সিএনজি, এলএনজি ব্যবহারের কথা মাথায় রেখেই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, সরকারের পক্ষ থেকে এ কথা জানিয়ে দেয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় এবং সিএনজি সিলিন্ডার সহজলভ্য হওয়ায় ইতিমধ্যে গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার অনেক বেড়েছে এবং বেড়ে চলেছে। গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে সারাদেশে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা ও সংখ্যা ইতিমধ্যেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল করেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে প্রতিদিন যে সব রোগী ভর্তি হচ্ছে তার বড় অংশই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ জণিত দুর্ঘটনা থেকে উদ্ভুত। কোনো দুর্ঘটনা ভয়াবহ ট্রাজেডির জন্ম দিচ্ছে। সারাবিশ্বে সিলিন্ডার গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির সাথে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঝুঁকিও ক্রমে বেড়ে চলেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে এ হার অন্য যে কোনো অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি। গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে একেকটি বাড়ি এবং গাড়ির যাত্রিরা যেন টাইমবোমার সাথে বসবাস করছে। যে কোনো সময়ে ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। অর্ধ শতাব্দী ধরে আমরা বাড়িতে রান্নাঘরে গ্যাসের জাতীয় গ্রীড থেকে ট্রান্সমিশন কোম্পানীর সঞ্চালিত গ্যাস ব্যবহার করছি। গ্যাসের চুলায় গ্যাস ব্যবহারে কোনো পরিমাপ বা বাধ্য বাধকতা না থাকায় এভাবে গ্যাস ব্যবহারে অনেক অপচয় হচ্ছে। তবে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ এবং ট্রান্সমিশন কর্মচারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনার কারণে গ্যাস সেক্টরে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি রান্নাঘরের অপচয় থেকে অনেক বেশি। গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি-লুটপাটের মধ্য দিয়ে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হওয়া বন্ধ করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে বছর বছর গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের উপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল- গ্যাসের মূল্য কমে অর্ধেকে নেমে গেলেও বাংলাদেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী তেলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। পাইপে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে অপচয় রোধে প্রতিটি গ্যাস সংযোগে মিটারযুক্ত করা এবং সঞ্চালন লাইনের সংস্কার আধুনিকায়ন ও অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদের ব্যবস্থা না করে জনগণের উপর সিলিন্ডার গ্যাসের বাড়তি ব্যয় এবং টাইমবোমার মত বিস্ফোরণের ঝুঁকিতে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। একদিকে জরুরী চাহিদা মিটানোর অজুহাতে রেন্টাল কুইকরেন্টাল বিদ্যুতকেন্দ্র থেকে বিদ্যুত কিনে প্রতি বছর অতিরিক্ত হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। কুইক রেন্টাল বিদ্যুতকেন্দ্রের মত এলএনজি খাতেও হয়তো ভতুর্কি গুনতে হবে সরকারকে, তবে এসব ভর্তুকির সুফল থেকে সাধারণ জনগণ সব সময়ই বঞ্চিত হয়। ভর্তুকির কথা বাদ দিলে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সঙ্গতি রেখে পণ্য মূল্যের বৃদ্ধি বা কমার কথা থাকলেও বাংলাদেশে ঘটেছে উল্টোটা। বিগত বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানির দাম কমছিল তখনো বাংলাদেশে বছরে একাধিকবার জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে দেখা গেছে। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতও জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভর দেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি এবং ডলারের মূল্য হ্রাসের কারণে গত জুলাই ও আগস্ট মাসে দিল্লীতে ১৪ কেজি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম প্রথমে ১০০.৫০ টাকা কমিয়ে ৭৩৭ টাকা থেকে কমে ৬৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল সরকার। ভারতে সিলিন্ডার গ্যাসে প্রতিটিতে ১৪২ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। এ হিসেবে একেকটি সাধারণ গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্য ৪৯৪ থেকে ৬২ কমে ৪৩২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভারতীয় মূদ্রার সাথে বাংলাদেশি মূদ্রার বিনিময় হারে পার্থক্য এখন শতকরা ১০ ভাগেরও কম হলেও বাংলাদেশে ১৪ কেজি গ্যাস সিলিন্ডার ভারতের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্যের চেয়ে এর নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে বেশি শঙ্কিত সাধারণ মানুষ। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে। মানহীন, নিরাপত্তাহীন গ্যাস সিলিন্ডারে প্রাণহানির ঘটনায় সিলিন্ডার ব্যবহার নিয়ে ক্রমেই শঙ্কিত হয়ে পড়ছে মানুষ। এহেন বাস্তবতায় গ্যাসের সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অপচয় দুর্নীতি রোধের কার্যকর পন্থা গ্রহণের দাবী ক্রমে জোরালো হয়ে উঠছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares